(সারার সাথে একদিন)

মেয়েটার নাম সারা, উচ্চতা ৫’-৬” বা ৭”, বয়স ২৪-২৫ হবে, দেখতে খুবই সুন্দর, গায়ের রং একদম দুধে আলতা যাকে বলে | আমি সাধারণত মেয়েদের দিকে ভালোভাবে তাকাইনা কিন্তু সারাকে দেখে আমার দৃষ্টি যেনো সরানো কঠিন | হাতে দামী একটা ব্রান্ডের ঘড়ি, গলায় একটা হোয়াইট গোল্ডের চেইন ও সুন্দর একটা হীরার লকেট (দেখেই মনে হচ্ছে এসকে জুয়েলার্স বা টাকা জুয়েলার্স এর হবে), কিন্তু কান ও নাক খালি | যদিও চাইনিজরা নাকফুল পরে না, তার পর ও খেয়াল করলাম দুই হাতের এক হাতেও কোনো আন্টি নাই, মানে এখনো বিয়ে করেনি সম্ভবত | পায়ের স্লীপার দেখেই বুঝা যায় সে ডিজাইনের চেয়ে কমফোর্ট বেশি পছন্দ করে |

সারা আমার দিকে এগিয়ে এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, তুমি কি নাজমুল? আমি বললাম, হ্যাঁ | ও বললো আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।চলো আমি তোমাকে আমাদের ডাটা সেন্টার বেসমেন্ট -৩ তে নিয়ে যাই | ও আমাকে দেখেই চিনতে পেরেছে কারণ আমি Sun Microsystem এর টি-শার্ট পরা ছিলাম | প্রথম পর্বে যেমনটা বলেছিলাম, তখন আমি সান মাইক্রোসিস্টেম এর সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করতাম এবং প্রতিদিন ২-৩টা কাস্টমার সাইটে সাপোর্ট দিতে যেতাম | সারাদের অফিসের একটা সার্ভারে সমস্যা হওয়াতে আমাকে পাঠানো হয়েছে, সমস্যাটা সমাধান করতে |

সিঙ্গাপুরে অর্চার্ড রোডের পাশে সমারসেট এ কম সেন্টার নামে SingTel এর একটা বিল্ডিং আছে তারই আন্ডার গ্রাউন্ড বেজমেন্ট ৩ এ ওদের ডাটা সেন্টার | লেভেল ১ এ সিকিউরিটি অফিস থেকে পাস কালেক্ট করে আমরা চলে গেলাম B-3 ডাটা সেন্টারে | সারা বলছিলো “কাল রাতে IN (ইন্টেলিজেন্ট নেটওয়ার্ক) সার্ভার এ কাজ করছিলাম হঠাৎ দেখি সার্ভার খুব স্লো | ভালো করে চেক করার পর বুঝতে পারলাম হাফ অফ সার্ভার মেমোরি ডিসএ্যাপিয়ার হয়ে গেছে | পরে লগ ফাইল চেক করে বুঝতে পারলাম সার্ভার এর একটা মাদার বোর্ড এ সমস্যা হচ্ছে” |

আমি বেশ অবাক হলাম | এক, মেয়েটা অনেক সুন্দর; আর দুই, মেয়েরা সাধারণত Unix নিয়ে কাজ করে না | Unix হচ্ছে একটা কমপ্লেক্স অপারেটিং সিস্টেম, এইখানে কাজ করলে ব্যাকএন্ডে কি হচ্ছে তার অনেক কিছু মনে রাখতে হয় | যেমন বুট প্রসেস, স্টার্টআপ স্ক্রিপ্ট, আরসি স্ক্রিপ্ট, কার্নেল ইত্যাদি ইত্যাদি | আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি , মেয়েরা সাধারণত কর্ম ক্ষেত্রে সহজ কাজটাই বেছে নেয় | সারা বললো ডাউন টাইম সকাল ১০:০০ থেকে ২টা , এখনো ২০মিনিট বাকি আছে তাই সার্ভার এ কিছু করতে মানা করলো | যেহেতু কিছুটা সময় হাতে পেলাম আর তাই কৌতূহল নিয়ে সারা কে জিজ্ঞাসা করলাম, “তুমি উনিক্স নিয়ে কেন কাজ করতে আসলে ?আরো তো অনেক জব ছিলো”|

সারা বললো, সে তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান | তার বাবা একটি ব্যাংকের ভিপি আর মা একজন ডাক্তার | মা-বাবা কে দেখে তার ইচ্ছে ছিলো অন্য কিছু করবে আর তাই ITE তে টেলিকমুনিকেশন এ গ্রাজুয়েশন শেষ করে SingTel এ জব নিয়েছে | সান সোলারিস এ ট্রেনিং করার পর তার টীম এ সেই একমাত্র মেয়ে Unix নিয়ে কাজ করে। কাজটাকে সে এ্যাডভেঞ্চার হিসাবে নিয়েছে |

সময়টা ছিলো শনিবার সকাল | সারা জিজ্ঞাসা করলো তুমি মুসলিম ? আমি বললাম, হুম | সে বললো,”তাহলে তো তোমার এই সময় হোম টাউন এ থাকার কথা, কারণ আজ শনি বার, কাল রবি বার আর সোমবারে হারি রায়া (ঈদ) | তার মানে তিন দিন ছুটি , এটা লং উইকেন্ড | তোমার তো দেশে যাওয়া উচিত”| আমি হেসে বললাম, সিঙ্গাপুর – বাংলাদেশ ৪ ঘণ্টা দূরত্ব, আমি চাইলে যে কোনো সময় চলে যেতে পারি |

আমি সার্ভিস রিপোর্ট হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম | আমার সহকর্মীরা সার্ভিস রিপোর্ট লিখে কাজ শেষে, কিন্তু আমি কাজ শুরু করার আগেই বেসিক ইনফরমেশন লিখে ফেলি | সারা আমার কাছে এসে বললো তোমার পেনটা খুব সুন্দর | আমার কাছে সান মাইক্রোসিস্টেম এর স্টেইনলেস একটা সুন্দর রেয়ার পেন ছিলো | সারা বলা মাত্রই আমি পেনটা ওকে দিয়ে দিলাম, বললাম, এটা তুমি নাও ; আমার এমন পেন বেশ কয়েকটা আছে | অথচ ওটাই ছিলো আমার একটি মাত্র শখের কলম | ওর মতো সুন্দর একটা মেয়েকে শখের একটি গিফট দিতে পেরে নিজেকে নিয়ে একটু গর্ববোধ করছিলাম |

সারা আমাকে সব সমস্যার বর্ণনা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো, তোমার কাজ শেষ হতে কতক্ষণ লাগবে? আমি বললাম ২-৩ ঘণ্টা | সে সার্ভার এর অ্যাডমিন/root পাসওয়ার্ড আমার হাতে দিয়ে বললো আমি ৩ ঘণ্টার জন্য বাইরে যাবো, আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে লাঞ্চ প্রোগ্রাম আছে | আমি হেসে বললাম কোনো সমস্যা নাই, আমি এর মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলবো | সারা চলে যেতে যেতেই কেনো যেনো নিজেকে একটু অসহায় লাগলো, আর এতো বড় ডাটা সেন্টারে আমি ছাড়া কোনো প্রাণী নাই আর তাই ভয়টা আরও একটু বেশি | কিন্তু যেহেতু আমি এই রকম আরো অনেকবার একা একা ডাটা সেন্টার এ কাজ করেছি, তাই নিজেকে অভয় দিয়ে কাজে মনোযোগ দিলাম |

আমি যে সার্ভার এ কাজ করতে এসেছি তার একজোড়া সার্ভার এর লিস্ট প্রাইস ছিলো ৪ কোটি টাকা আর তাই ভয়টা একটু বেশি যদি এদিক থেকে ওদিক করে ফেলি, তারপর এটা ছিলো লাইভ প্রোডাকশন সার্ভার এবং আমি একা |

যাই হোক, ১.৫-২ ঘণ্টার মধ্যে আমি সান ৬৪০০ সার্ভার এর মাদার বোর্ড চেঞ্জ করে রিসোর্স সব এনাবল করে দিলাম | যেহেতু এই সার্ভার এ এরিক্সসন এপ্লিকেশন রান করছিলো, আর আমি ঢাকায় গ্রামীণ ফোন ও একটেল এর বেশ কয়েকটা সার্ভার এর এরিক্সসন এপ্লিকেশন নিয়ে কাজ করেছি এবং এরিকসন ঢাকায় মাহফুজ ভাই এর কাছে থেকে কিছু কিছু কম্যান্ড ও শিখেছিলাম, সেই গুলি দিয়ে সিস্টেম ও এপ্লিকেশন এর হেলথ চেক করছিলাম |

এদিকে সময় ১টা …২টা …৩টা বেজে গেছে | সারার কোনো খবর নাই | হঠাৎ ভাবলাম একটা মেসেজ দিবো আর কতক্ষণ লাগবে জানতে, মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখি কোনো সিগন্যাল নাই, মোবাইল কাভারেজ জিরো | আজব ব্যাপার হচ্ছে আমি SingTel লাইন ইউজ করি, আর SingTel ডাটা সেন্টার এ তাদের কাভারেজ নাই | এইবার আমি একটু ভয় ও পেয়ে গেলাম | সকালে ব্রেকফাস্ট করিনি ভেবেছিলাম কাজটা শেষ করে একবারে লাঞ্চ এ যাবো | আশেপাশে খুঁজে একটা ল্যান্ড লাইন(আমরা যেটাকে টি-এন্ড -টি লাইন বলি) ফোন খুঁজে পেলাম কিন্তু সেটাও কাজ করে না |

হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৫টা বেজে গেছে কিন্তু সারার কোনো খবর নাই | আশেপাশে ঘুরাঘুরি করে ডাকছিলাম “এনি বডি হেয়ার? এনি ওয়ান ক্যান হেল্প প্লিজ” কিন্তু কাঁচে ঘেরা ডাটা সেন্টার এ আমার কথা কোথাও গেলো বলে মনে হলোনা | অনেক ক্ষণ পর অনেক দূরে একটা CCTV দেখে, অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করছিলাম কিন্তু কোনো লাভ হলো না | ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৭টা বাজে | আমার ক্ষুধায় নাড়িভুড়ি সব হজম হয়ে যাবার উপক্রম | ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার কোনোটাই করিনি | সব চেয়ে বড় ভয় আগামী তিন দিন সিঙ্গাপুরে অফিস আদালত সব বন্ধ | বার বার মনে হচ্ছে, আমি আগামী তিনদিন না খেয়ে মারা যাবো | ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ৮টা বেজে গেছে | এইবার বুঝতে পারলাম একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আমাকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না |

সার্ভার এর সামনে বসে মনে মনে আল্লাহ কে ডাকছিলাম আর দোয়া পড়ছিলাম |

তার অনেকক্ষন পর হঠাৎ …..!!

চলবে ….. |

আজ এই পর্যন্তই থাক | আগামী পর্বে কিভাবে ওখান থেকে জীবিত ফিরলাম ও পরে সারার সাথে আমার কি হয়েছিল তার রহস্য ….. সব বলবো | ভালো লাগলে জানাবেন, ভুল হলে ক্ষমা করবেন |